বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা: শতবর্ষ পার করা প্লেট যে কোনো সময় সক্রিয় হতে পারে
বাংলাদেশ অঞ্চলে সবশেষ বড় ভূমিকম্প হয়েছিল ১৯৩০ সালে, যার মাত্রা ছিল ৭। তারও আগে ৬৫ বছরের ব্যবধানে ভূমি তছনছ করা শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল অন্তত ৬ বার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্দিষ্ট করে সময় বলা সম্ভব না হলেও প্রায় শত বছর ধরে চাপ জমে থাকা টেকটনিক প্লেট যেকোনো সময় বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করতে পারে। তাই এখনই বাসাবাড়ি ও অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনীয় করে তোলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
সাম্প্রতিক কম্পনে বাড়ছে উদ্বেগ
গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা ইন্দো-বার্মা টেকটনিক প্লেটের অংশে সংঘটিত হয়। এতে কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে। এর মাত্র তিন মাস পর গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর ৫.৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারাদেশ।
চলতি মাস শেষ হওয়ার আগেই ১০ দফা কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে—গড়ে প্রায় দুই দিনে একটি। ঘনঘন এই কম্পন বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস কিনা, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বারবার ভূমিকম্প হলে বোঝা যায় প্লেট বাউন্ডারিতে শক্তি জমা হচ্ছে। এই শক্তি দীর্ঘদিন জমে থাকলে একসময় বড় ধরনের বিস্ফোরণের মতো কম্পনে রূপ নিতে পারে। তাই বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তিনি ভবন মূল্যায়নের (বিল্ডিং অ্যাসেসমেন্ট) ওপর জোর দিয়ে বলেন, প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ভবন মালিকদের সচেতন করতে হবে। অন্যথায় ঝুঁকি থেকেই যাবে।
অন্যদিকে ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী জানান, ছোট ছোট ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। তবে অতীতে ঘটে যাওয়া বড় ভূমিকম্পগুলো বিবেচনায় নিলে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে।
ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
১৮৯৭ সালের ১২ জুন সংঘটিত ‘Great Indian Earthquake’ ছিল ৮ মাত্রারও বেশি শক্তিশালী। গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের পাশ দিয়ে যাওয়া বড় প্লেট বাউন্ডারি এবং অভ্যন্তরীণ ফল্ট লাইনে ১০০ থেকে ১৫০ বছর পরপর ৭ এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। ৮ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প ২৫০ থেকে হাজার বছর পরপর ফিরে আসার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানীসহ সারাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু রাজধানী ঢাকায় রয়েছে প্রায় ২১ লাখ বাসাবাড়ি, যার ৩০ শতাংশই ৬ তলার বেশি। এসব ভবনের ৯০ শতাংশই ভূমিকম্প সহনীয় নয়। সারাদেশেও শত শত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও অবকাঠামো রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ভূমিকম্পের আগেই যদি ভবন শক্তিশালী করা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বাড়ানো যায়, তাহলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
