সড়ক পরিবহনে চাঁদাবাজি নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য: সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বার্তা?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে স্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো-এর খবরে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী মন্তব্য করেন—পরিবহন খাতে যে অর্থ তোলা হচ্ছে তা “সমঝোতার ভিত্তিতে”, জোর করে আদায় নয়; তাই একে চাঁদা বলা যায় না। অথচ তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, কল্যাণের নামে তোলা অর্থের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং শ্রমিক সংগঠনে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্য থাকে।
এই অবস্থায় ‘সমঝোতা’ শব্দ ব্যবহার করে অর্থ আদায়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন জনমনে স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে।
সড়ক পরিবহন খাতে নৈরাজ্য: দুর্ঘটনা নাকি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড?
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থার নৈরাজ্য দীর্ঘদিনের। প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি মানুষ সড়কে প্রাণ হারান—যাঁদের অধিকাংশই তরুণ ও কর্মক্ষম। এই ধারাবাহিক প্রাণহানি নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এক ধরনের কাঠামোগত ব্যর্থতা ও দুর্নীতিপুষ্ট ব্যবস্থার ফল।
২০২৪ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। ট্রাক ও মিনি ট্রাক থেকেও আদায় করা হয় বিপুল অর্থ।
রাজনৈতিক প্রভাব, অসাধু আঁতাত ও জনগণের বোঝা
অভিযোগ রয়েছে, যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের প্রভাবপুষ্ট পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর অসাধু কর্মকর্তাদের আঁতাত গড়ে ওঠে। ফলে দুর্নীতিপুষ্ট এই চক্র সড়কের শৃঙ্খলা নষ্ট করে এবং চাঁদাবাজিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
পরিচালন ব্যয়ের বাইরে ‘চাঁদা’ বা ‘কল্যাণ তহবিল’—যে নামেই অর্থ তোলা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তার বোঝা পড়ে সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তার ওপর। পরিবহন ভাড়া বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে নিত্যপণ্যের দামে। অর্থাৎ পরিবহন খাতের দুর্নীতি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শ্রমিকরাও ভুক্তভোগী
এই নৈরাজ্যিক ব্যবস্থার শিকার শুধু নাগরিক নন, চালক ও সহকারীরাও। আইন অনুযায়ী নিয়োগপত্র ও মাসিক বেতন নিশ্চিত করাই প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণ। কমিশনভিত্তিক অনিরাপদ আয়ের কারণে চালকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, যা বেপরোয়া গাড়ি চালনার ঝুঁকি বাড়ায়।
শক্ত বার্তা ছাড়া শৃঙ্খলা সম্ভব নয়
সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সরকারের অন্যতম বড় দায়িত্ব। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা ছাড়া কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না।
যদি সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য হয় সুশাসন ও দুর্নীতি দমন, তবে পরিবহন খাতে ‘সমঝোতা’র ভাষ্য নয়, প্রয়োজন কঠোর অবস্থান ও স্পষ্ট বার্তা। শুরু থেকেই শক্ত পদক্ষেপ না নিলে সড়কে প্রাণহানি ও নৈরাজ্য কমানো সম্ভব হবে না।
