কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় রেললাইনের জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলার তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ছয় বছর পার হলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, মামলার আসামিদের মধ্যে প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তারা থাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্তে বিলম্ব করা হচ্ছে।
২০২০ সালে রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের লম্বরীপাড়া এলাকার ২০টি দরিদ্র পরিবারের ক্ষতিপূরণের টাকা জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে তুলে নেওয়ার অভিযোগে জাহানারা বেগম নামের এক ভুক্তভোগী মামলা করেন। মামলায় কক্সবাজারের তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফছার, ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবু হাসনাত, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা দেবতোষ চক্রবর্তী, কানুনগো মোখলেছুর রহমান, সার্ভেয়ার মাসুদ রানা এবং দালাল শাহজাহান ও শামসুল আলমসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করা হয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান থাকায় ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ অমান্য করে এলএ শাখার কিছু কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে চেক ইস্যু করে টাকা তুলে নেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত শুরু হলে একের পর এক অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সামনে আসে। তদন্তের সময় বিপুল পরিমাণ নথি ও জাল কাগজপত্র জব্দ করা হয় এবং কয়েকজনকে আটকও করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, তদন্তে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং শুধু বদলি করা হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় ইতোমধ্যে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু এতদিনেও কোনো তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেননি।
আরএস ৯৮ খতিয়ান অনুযায়ী জমিটির মালিক ছিলেন মৃত জীবন আলী। তার তিন ছেলে—আন্নর আলী, মনির উদ্দিন ও ওয়াজ উদ্দিন। ওয়াজ উদ্দিন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি বাকি দুই ভাইয়ের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের বংশধরদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে বর্তমানে প্রায় ২০টি পরিবার ওই জমির ওয়ারিশ হিসেবে রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জমি অধিগ্রহণের প্রায় দুই কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করেছেন শুধুমাত্র মনির উদ্দিনের ছেলে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশরা। নুরুল হক, ইব্রাহিম খলিল, রাশেদা বেগম ও আনোয়ারা বেগমের নামে চারটি পৃথক চেকের মাধ্যমে এই অর্থ উত্তোলন করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জাল আম-মোক্তারনামা তৈরি করে এলএ শাখার কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের সহায়তায় এই টাকা তোলা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের তালিকায় নাম থাকলেও নুরুল হক নিজেই প্রতারণার অভিযোগ করেছেন। তার ভাষ্য, দালালচক্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে জীবন আলীর সব ওয়ারিশই ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন। কিন্তু বাস্তবে কেবল মনির উদ্দিনের বংশধররাই সেই অর্থ পেয়েছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, চেক ইস্যুর আগেই দালাল শাহজাহানসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ টাকা অগ্রিম হিসেবে চলে যায়। ফলে প্রায় দুই কোটি টাকার মধ্যে মোহাম্মদ কালুর ওয়ারিশদের হাতে পৌঁছায় মাত্র ৯০ লাখ টাকা।
মামলার আম-মোক্তার বাদী ওসমান গণি, যিনি জাহানারা বেগমের স্বামী, অভিযোগ করেন—আদালত ও দুদকের দপ্তরে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে একাধিকবার লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এমনকি পেনড্রাইভ ও মেমোরি কার্ডে জালিয়াতি ও ঘুষ লেনদেনের অডিও রেকর্ডও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তবুও ছয় বছরেও কোনো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা হয়নি।
এদিকে মামলার অগ্রগতি না হওয়ায় বাদীপক্ষ আদালতে লিখিতভাবে অভিযোগ করলে আদালত গত ২৫ জানুয়ারির মধ্যে বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়াকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও এখনো সেই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি।
ওসমান গণির অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের রক্ষা করতেই তদন্তে গড়িমসি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, অসহায় সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎকারীদের বাঁচাতে দুদকের কিছু কর্মকর্তা মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
সম্প্রতি তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়া ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদে লম্বরীপাড়া এলাকার ওয়ারিশ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে একটি নোটিশ পাঠান। ইউনিয়ন পরিষদ তাদের রেকর্ড অনুযায়ী প্রতিবেদন পাঠালেও সেটি গ্রহণ না করে উল্টো পরিষদকে ভিন্ন তথ্য দিতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন জানান, তদন্ত কর্মকর্তা পরিষদে এসে তদন্ত করেন এবং শুরুতে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন। তবে তারা আগের চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিবেদন পাঠানোর কথা জানিয়েছেন।
বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি ছুটিতে আছেন এবং এ বিষয়ে জানতে হলে অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। আগের তদন্ত কর্মকর্তা তাপছির বিল্লাহও একই ধরনের মন্তব্য করেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট টুটুল পাল বলেন, ছয় বছর ধরে দুদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিচ্ছে না, যা অস্বাভাবিক। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তদন্তে এমন বিলম্ব হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তিনি জানান, মামলার পরবর্তী তারিখে পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘদিন আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে বাদীপক্ষ প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে দুদকের কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, তিনি বর্তমানে কক্সবাজারের বাইরে রয়েছেন।
