যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা পাল্টা শুল্কভিত্তিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন অর্থনীতিবিদেরা। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
সুবিধার ভারসাম্যে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৬,৭১০টি পণ্যে শুল্কছাড় দিতে হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি ১,৬৩৮টি পণ্যে পাল্টা শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু যে পাল্টা শুল্ককে কেন্দ্র করে এ সুবিধা নির্ধারিত হয়েছিল, আদালতের রায়ে সেটিই বাতিল হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের প্রত্যাশিত সুবিধা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর ২০২৫ সালের আমদানি–রপ্তানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়:
- যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত ৬,৭১০ পণ্যের মধ্যে ২,০১৬টি পণ্য বাংলাদেশ গত বছর আমদানি করেছে।
- এসব পণ্যের আমদানিমূল্য ছিল প্রায় ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার।
- শুল্ক কমানো বা প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমতে পারে প্রায় ৪১৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যে ১,৬৩৮টি বাংলাদেশি পণ্যে সুবিধা দেওয়ার কথা বলেছে, তার মধ্যে গত বছর রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১৪টি পণ্য—মোট মূল্য প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সম্ভাব্য রাজস্ব ছাড়ের পরিমাণ হতো মাত্র প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ডলার।
ট্রাম্পের নতুন শুল্ক ঘোষণা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে চুক্তি বহাল থাকলেও বাংলাদেশের সম্ভাব্য সুবিধা আরও কমে যেতে পারে।
বড় রপ্তানি খাতেও অনিশ্চয়তা
তৈরি পোশাক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্য ‘হ্যাট অ্যান্ড আদার হ্যাটগিয়ার’—গত বছর যার রপ্তানি ছিল প্রায় ২৫ কোটি ডলার। এই একক পণ্যে শুল্কসুবিধা মিললে সামগ্রিক সুবিধার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন হতে পারত।
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)-এর ওয়েবসাইটে বাংলাদেশসহ আটটি দেশের ‘রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড’ চুক্তি প্রকাশিত হয়েছে। তবে চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো স্পষ্ট নয়।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই পাল্টা শুল্ক অবৈধ হওয়ায় এর তাৎপর্য অনেকটাই কমে গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে দেশভিত্তিক বা পণ্যভিত্তিক অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারে—যা বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্য ভারসাম্যে সুবিধার পাল্লা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই বেশি ঝুঁকে রয়েছে।
