ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গোপালগঞ্জসহ চার জেলায় পুলিশের বাড়তি নজরদারি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গোপালগঞ্জসহ চার জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে পুলিশ। ভোটের আগে ও ভোটের দিন নাশকতা, সহিংসতা এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর আশঙ্কায় এসব জেলাকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুর জেলায় অতীতের রাজনৈতিক সহিংসতার রেকর্ড এবং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে আলাদা নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর ওপর হামলা এবং গত বছরের জুলাইয়ে এনসিপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাগুলোকে ঝুঁকি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চার জেলায় ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিতে ভয়ভীতি প্রদর্শনের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের আশপাশে বহিরাগতদের চলাচল, রাজনৈতিক কর্মীদের তৎপরতা ও সন্দেহজনক কার্যক্রমের ওপর বাড়তি নজরদারি চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জেলা পুলিশ সুপাররা (এসপি) এলাকাভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করছেন, যা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি), গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বৈঠকও চলছে। পাশাপাশি গোপালগঞ্জ-সংলগ্ন জেলা হওয়ায় খুলনা ও বাগেরহাটেও অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন,
“ভোটারদের নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যাওয়া, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়া এবং নিরাপদে ঘরে ফেরা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনের আগে যেন ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সব নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।”
দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি
ভোটকে ঘিরে সহিংসতা, কেন্দ্র দখল কিংবা আতঙ্ক সৃষ্টির আশঙ্কায় এবার দেশজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও গণপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে দুটি বড় ধরনের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ভোটের আগে বা ভোটের দিন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি। দ্বিতীয়ত, প্রার্থী বা তাঁদের সমর্থকদের দ্বারা ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা—যার মধ্যে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও সহিংসতা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এ ছাড়া গুপ্ত হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের আশঙ্কাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নির্বাচন-পূর্ব সময়ে তল্লাশিচৌকি, মোবাইল প্যাট্রল ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পেশাদার সন্ত্রাসী, ভাড়াটে খুনি ও শুটারদের গ্রেপ্তারে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ইতিমধ্যে সন্দেহভাজনদের তালিকা সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোতে পাঠিয়েছে।
ভোটের দিন ডিজিটাল নজরদারি
নির্বাচনের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোয় প্রায় ২৫ হাজার ৫০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার ক্যামেরা সিম কার্ড সংযুক্ত থাকবে, যা দিয়ে প্রয়োজনে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। বাকি ক্যামেরাগুলো অফলাইনে ভিডিও ধারণ করবে, যা পরে যাচাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হবে।
প্রতিটি থানা, জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে মনিটরিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যাতে সরাসরি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ ছাড়া ভোটের নিরাপত্তায় ৫০০টি ড্রোন ও প্রায় ৫০টি ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে সরকার।
সারা দেশে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ২১ হাজার ৯৪৬টি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। এর বাইরে বিদ্যুৎবিহীন কেন্দ্রগুলোতেও সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তায় প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার, বিজিবি, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা থাকবেন। ভোটের চার দিন আগে বাহিনীগুলো মোতায়েন করা হবে এবং ভোটের পর আরও সাত দিন মাঠে থাকবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক গানম্যান, বাসাবাড়িতে পুলিশ প্রহরা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রটোকল গাড়ির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
