বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সংকট: বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির অদক্ষতার প্রভাব
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং তিনটি প্রধান তেল বিতরণ কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। সময়মতো তেলের পর্যাপ্ত মজুত না রাখায় সারা দেশে তেলের ঘাটতি ও অরাজকতা দেখা দিয়েছে।
২০২০ সালে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কমপক্ষে ৬০ দিনের তেলের মজুত রাখার, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশটির তেল মজুত মাত্র ৩০–৩৫ দিনের সমান। এর মধ্যে ডিজেলের মজুত মাত্র ১০–১১ দিনের মতো। তুলনায় প্রতিবেশী ভারত ৭৪ দিনের, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ৩০ দিনের, নেপাল ১০ দিনের এবং জাপান ২৫০ দিনের তেল মজুত রাখে।
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “বর্তমান ৩০–৩৫ দিনের মজুত কোনো ধরনের আপৎকালীন সক্ষমতা হিসেবে ধরা যায় না। এটি মূলত পরিচালনার জন্য সামান্য স্টক মাত্র।”
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিতরণ কোম্পানিগুলো তেলের মজুত বাড়ানোর পরিবর্তে ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ আয় করতে আগ্রহী। উদাহরণস্বরূপ, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কর্মচারীরা গত অর্থবছরে ১৮ লাখ টাকা বোনাস পেয়েছেন।
ড. এম তামিম, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, উল্লেখ করেছেন যে বিপিসি অদক্ষ এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তেল মজুতের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের ডিজেলের মজুত ৯ দিনে নেমে যায়, ফলে সরকারের তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
রিপোর্ট অনুযায়ী, বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানি ২–৪ মার্চ পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন ও ডিলারদের ডিপো থেকে প্রায় দ্বিগুণ তেল বিক্রি করে। স্বাভাবিক বিক্রি ছিল ৪৫ হাজার টন, কিন্তু ওই সময়ে ৭০ হাজার টন বিক্রি হয়েছে।
বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির অদক্ষতার প্রমাণ হিসেবে সরকার বিপিসির দুই পরিচালককে ওএসডি করেছে। পাশাপাশি, তেলের মজুত বাড়াতে নতুন ট্যাংক স্থাপন ও প্রকল্প চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বড় প্রকল্পগুলো, যেমন সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM), এখনও কার্যকর নয়।
তিনটি বিতরণ কোম্পানির আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় তারা কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না। বছরে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক সুদ ও কর্মচারীদের উচ্চ বোনাস তাদের মূল লাভের উৎস।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে কমপক্ষে ৯০ দিনের তেলের রিজার্ভ থাকা উচিত। এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের মাধ্যমে এই রিজার্ভ তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু বিপিসি এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো ব্যাংক সুদ নিয়ে নগদ লাভ পেতে চায়।
সারসংক্ষেপ:
দেশের জন্য প্রয়োজন ৯০ দিনের রিজার্ভ, যা এখনো পূর্ণ হচ্ছে না।
দেশীয় তেলের মজুত এখন ৩০–৩৫ দিনের মতো, ডিজেল মাত্র ১০–১১ দিন।
প্রতিবেশী ও এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মজুত কম।
বিপিসি ও বিতরণ কোম্পানির অদক্ষতা, জ্বালানি নিরাপত্তায় উদাসীনতা।
ব্যাংক সুদে বিনিয়োগ ও উচ্চ বোনাসের কারণে তেলের মজুত বাড়ানো হচ্ছে না।
