বাংলাদেশে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও ইতোমধ্যেই শপথ নিয়েছেন। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবেন এবং কখন আসবেন তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ছাত্র ও জনতার পক্ষ থেকে তার পদত্যাগের দাবি ওঠে। যদিও পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি ছিল, বিএনপি শুরু থেকেই এতে আপত্তি জানায়। শেষ পর্যন্ত তার কাছেই নতুন নির্বাচিত সরকার শপথ গ্রহণ করেছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। তাই পদে থাকাকালীন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা আইনগতভাবে সম্ভব নয়। সংবিধান বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি যদি পদত্যাগ না করেন বা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ না হন, নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবে না। আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল জানিয়েছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। পদ শূন্য হলে নতুন সংসদ কার্যক্রম শুরু করবে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। তবে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের জুলাই সনদে প্রধানমন্ত্রীর ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি পাবে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার প্রধান তিনটি কারণ হলো: মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা গুরুতর অসদাচরণ। সংবিধান অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর, সর্বোচ্চ দুইবার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ২০২৪ সালের অক্টোবরেও পদত্যাগের দাবি ওঠে, তবে পদত্যাগ বা অপসারণ ঘটেনি।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি পদত্যাগ করতে চান। তিনি বলেন, নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করা উচিত। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণের পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসতে পারে।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী: নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তার পদে প্রবেশের দিন থেকে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি রাষ্ট্রপতির পদে থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচন কমিশন সংবিধান অনুযায়ী আয়োজন করে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বয়স ৩৫ বছরের কম বা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা না থাকলে কেউ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না।
১৯৯১ সালের সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসার পর সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বন্ধ হয়। এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, স্পিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে ভোটের তফশিল ঘোষণা করা হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পদ শূন্য হলে নব্বই থেকে ষাট দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একক প্রার্থী থাকলে ভোটের প্রয়োজন হয় না।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বিষয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত, তাই পদটি অনেক সময় ‘আলংকারিক’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে রাজনৈতিক সংকট বা নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা ভারতে চলে গেলে রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব বেড়ে যায়। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন।
জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়োগে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। তবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হবে।
নতুন সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন কখন শুরু হবে তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। এই অধিবেশন শুরুর আগে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব কম।
